আসল রহস্য ফাঁসঃ ভাড়াটে খুনি দিয়ে স্ত্রীকে নিজেই হ’ত্যা করান এসপি বাবুল

বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার নিজেই পরিকল্পনা করে এবং নির্দেশ দিয়ে ভাড়াটে খুনি দিয়ে তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে হত্যা করিয়েছেন। এজন্য ভাড়াটে খুনিদের তিনি দিয়েছেন তিন লাখ টাকা।

বিদেশি এনজিও সংস্থার কর্মী গায়ত্রী অমর সিংয়ের সঙ্গে পরকীয়া নিয়ে দাম্পত্য কলহের জেরে বাবুল আক্তার নিজের স্ত্রীকে হত্যার মতো জঘন্য সিদ্ধান্ত নেন। পিবিআইর তদন্তে মিতু হত্যার রহস্য এভাবে উদ্ঘাটন হয়।

এদিকে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মিতু হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা বাবুল আক্তার- এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এ কারণে নির্দেশদাতা বাবুল আক্তারসহ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও

পরোক্ষভাবে জড়িত সাতজনকে আসামি করে চার্জশিট প্রস্তুত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আগামী সপ্তাহে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।

মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তার ছাড়াও অন্য যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে তারা হলেন- মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা, এহতেশামুল হক প্রকাশ ভোলোা, মো. মোতালেব মিয়া ওয়াসিম,

মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খাইরুল ইসলাম কালু এবং শাহজাহান মিয়া। মিতু হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ইতঃপূর্বে গ্রেফতার হওয়া চারজনকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরীর পাঁচলাইশ থানার নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে বাসার কাছে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় মাহমুদা খানম মিতুকে। স্ত্রীকে খুনের ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরের তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তার বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদসহ নানা নাটকীয়তার পর ওই বছরের আগস্টে বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বাবুল আক্তার বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মহানগর পিপি মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী বুধবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তার জড়িত ছিলেন। তার পরিকল্পনা ও নির্দেশে খুন হন স্ত্রী মিতু। মূল অভিযোগপত্র নয় পৃষ্ঠার। তবে এর সঙ্গে দশ খণ্ডের নথি সংযুক্ত করা হয়েছে। মামলার সাক্ষ্যস্মারকে (এমওই) আমি এরইমধ্যে স্বাক্ষর করে দিয়েছি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, স্ত্রী মিতু হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড সাবেক বরখাস্তকৃত এসপি বাবুল আক্তার। বাবুল আক্তার কক্সবাজারে কর্মরত থাকা অবস্থায় বিদেশি এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি হয়। এ কারণে বাবুল আক্তার তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিন লাখ টাকায় ‘খুনি’ ভাড়া করে স্ত্রীকে খুন করান। নিজেকে আড়ালে রাখতে প্রচার করেন- জঙ্গিরাই মিতুকে খুন করেছে। মিতুকে খুনের মিশনে নেতৃত্ব দিয়েছে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুলের ‘সোর্স’ মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা। সঙ্গে ছিল আরও ছয়জন। হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আক্তার মুসাকে ফোনে গা ঢাকা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

এদিকে মিতু খুনের পর মামলায় গ্রেফতার হওয়া চারজনকে অভিযোগপত্রে অব্যাহতি দিয়েছে পিবিআই। এরা হলেন- মো. সাইদুল ইসলাম সিকদার সাক্কু, নুরুন্নবী, রাশেদ ও গুইন্যা।

একটি বইয়ের লেখার সূত্র ধরে মামলার জট খোলে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মামলার আলামত হিসাবে উপহার পাওয়া বাবুল আক্তারের একটি বই জব্দের পর হত্যাকাণ্ডের জট খোলে। ২০১৩ সালে কক্সবাজার জেলা পুলিশে কর্মরত থাকার সময় বাবুলের সঙ্গে সেখানে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত গায়ত্রী অমর সিংয়ের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

গায়ত্রী বাবুলকে আহমেদ রশিদ রচিত ইংরেজি ভাষার ‘তালিবান’ নামে একটি বই উপহার দেন। ওই বইয়ের তৃতীয় পাতায় গায়ত্রী অমর সিংয়ের নিজের হাতে লেখা এবং শেষ পাতা ২৭৬-এর পরের খালি পাতাটিতে বাবুল আক্তারের হাতে লেখা ইংরেজিতে তাদের ‘প্রথম সাক্ষাত’র বিষয়সহ রোমান্সকর মুহূর্তের কিছু বিবরণ লেখা ছিল।

গ্রেফতার ভোলা, ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে মিতু হত্যার দায় স্বীকার করেছে। এর মধ্যে ভোলা তার জবানবন্দিতে অপর আসামি মুসার সঙ্গে কথোপকথনের বিষয় উলে­খ করে। সেখানে বাবুল আক্তার যে মুসাকে তার (বাবুল আক্তারের) স্ত্রীকে হত্যার বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন সেটি উল্লেখ আছে। তাছাড়া সাইফুল ইসলাম নামে নিজের এক ব্যবসায়ীক অংশীদারের মাধ্যমে বাবুল আক্তার তার স্ত্রী মিতুকে হত্যার জন্য ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন সেটিও জবানবন্দিতে এসেছে।

মামলার আসামিদের মধ্যে মুসা ও কালু পলাতক বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। কারাগারে আছেন- বাবুল আক্তার, ওয়াসিম, শাহজাহান মিয়া ও আনোয়ার হোসেন।

মিতু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে হদিস মিলছে না কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুসার। তার স্ত্রী পান্না আক্তার দাবি করেন, মুছাকে হত্যাকাণ্ডের পর ২০১৬ সালের ২২ জুন প্রশাসনের কিছু লোক ধরে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ মিলছে না। মিতু হত্যা মামলায় মুসার স্ত্রী পান্না আক্তার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে ৯৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এর মধ্যে মুসার স্ত্রী পান্না আক্তার এবং বাবুলের বন্ধু সাইফুলও রয়েছেন।

২০২১ সালের ১১ মে বাবুল আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। পরদিন বাবুল আক্তার মামলায় আদালতে ৫৭৫ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ওই বছরের ১২ মে বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তারসহ আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

মামলার বাকি সাত আসামি হলেন- মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা, এহতেশামুল হক ভোলা, মো. মোতালেব মিয়া ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খাইরুল ইসলাম কালু, মো. সাইদুল ইসলাম।

চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতের পর্যবেক্ষণ মেনে মোশাররফের মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। একইসঙ্গে ওই মামলার ডকেট প্রথম মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করে তদন্তের জন্য আবেদন করেন। আদালত অনুমতি দিলে শুধু বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলাটির তদন্তই চলমান থাকে। এখন বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলায় বাবুল আক্তারকেই চার্জশিটে প্রধান আসামি করা হলো। অর্থাৎ স্ত্রী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় বাদী থেকে আসামি হলেন বাবুল আক্তার।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, মিতু হত্যাকাণ্ড বাবুল আক্তারের পরিকল্পনাতেই হয়। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছি। খুব শিগগিরই আদালতে জমা দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে পিবিআই প্রধানও অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক বনজ কুমার মজুমদার বুধবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, মামলাটি তদন্ত শেষ পর্যায়ে। চার্জশিটটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এখনো আমার কার্যালয়ে আসেনি। তবে খুব শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *