শারজায় ‘রক্ত, ঘাম আর চোখের জলের’ এক রাত

শারজা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের একটা আলাদা ব্যাপার আছে। ধূসর রঙে মোড়ানো ঐতিহ্যময় এ মাঠে ঢুকলেই নিজেকে ২২ গজের অংশ মনে হয়। মূল মাঠ থেকে সবকিছুই খুব কাছে বলেই হয়তো এমন লাগে।

গ্যালারি, প্রেস বক্স, কমেন্ট্রি বক্স—সবই যেন মূল মাঠ থেকে হাতছোঁয়া দূরত্বে। লং অন, লং অফ বাউন্ডারিতে থাকা ফিল্ডারের সঙ্গে প্রেস বক্স থেকেই আলাপ জুড়ে দেওয়া যায়। দূরত্ব যখন কম, খেলোয়াড়দের আবেগ, স্নায়ুর চাপও যেন মাঠে উপস্থিত সবাইকে ছুঁয়ে যায়।

গত রাতে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের ম্যাচে অন্তত এমনই মনে হয়েছে। কী ছিল না এই ম্যাচে! শারজার মন্থর উইকেটে স্লো স্কোরিং ম্যাচের রোমাঞ্চ তো ছিলই; আফগান পেসার ফরিদ আহমেদকে আসিফ আলী ব্যাট দিয়ে মারার ভঙ্গি করে মাঠ কাঁপিয়ে তোলেন।

মুহূর্তের জন্য আসিফকে মনে হয়েছে জাভেদ মিয়াঁদাদ, আর আফগান পেসার ফরিদ যেন সেই ডেনিস লিলি। লিলি যেমন মিয়াঁদাদকে স্লেজিং করে রাগিয়ে তুলেছিলেন, কাল ফরিদও আসিফকে আউট করে কী যেন বলে ফেলেন, যা শুনে মেজাজ শান্ত রাখতে পারেননি পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান।

ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্যাট উঁচিয়ে ফরিদকে মারতে যান আসিফ।দৃশ্যটি দেখে গ্যালারিতে দর্শকেরাও উত্তেজিত হয়ে পড়েন। রাগে–ক্ষোভে কয়েকটি পানির বোতল গ্যালারি থেকে মাঠে ছোড়া হয় সঙ্গে সঙ্গে। শারজার ছোট্ট গ্যালারি থেকে ছোড়া পানির বোতল মাঠেও এসে পড়ে। ভাগ্য ভালো, তাতে কোনো খেলোয়াড়ের ক্ষতি হয়নি।

ওদিকে রাগে ফুঁসতে থাকা আসিফ মাঠ ছাড়ার আগে বাউন্ডারির কুশনে সজোরে ব্যাট চালান। দলকে ম্যাচ জিতিয়ে আসতে পারেননি, সে হতাশার ওপর বোলারের সঙ্গে এই ঝগড়া, শারজার গরম যেন আসিফের মতো ঠান্ডা মাথার ফিনিশারকেও ছুঁয়ে গেছে।

এই লঙ্কাকাণ্ডের পর পাকিস্তানের জয়ের জন্য যখন ৬ বলে ১১ রান দরকার, বোলার নাসিম শাহ হঠাৎই ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠেন। ফজল হক ফারুকির শেষ ওভারের প্রথম ২ বলেই ২ ছক্কা মেরে মাতেন বুনো উল্লাসে। শেষ ছক্কাটা যখন লং অফ ফিল্ডার রশিদ খানের মাথার ওপর দিয়ে বাউন্ডারির সীমানা ছাড়ায়,

তখন বোলার ফারুকিসহ তিন থেকে চারজন আফগানিস্তানি ফিল্ডার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কান্নায়।ওদিকে নাসিমকে ঘিরে উল্লাস চলছেই। সেই উল্লাসে যোগ দিয়েছেন ধারাভাষ্য দিতে আসা কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরামও। শারজার এ দৃশ্য দেখে মনে হবে, এক ক্যানভাসে যেন আনন্দ ও কান্না মিলেমিশে একাকার।

এদিকে যখন পাকিস্তানের জয় উদ্‌যাপন চলছিল, গ্যালারিতে শুরু হয়ে যায় আরেক ‘যুদ্ধ’। দুই দলের সমর্থকদের কথা-কাটাকাটি পরে রূপ নেয় মারামারিতে। খেলা শেষ হতে না হতেই গ্যালারির চেয়ার খুলে দর্শকদের একটা অংশ একজন আরেকজনের দিকে ছুড়ে মারতে থাকে।

এ ঘটনায় অনেকে আহত হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকদের মারামারির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। খেলা শেষে মাথা থেকে রক্ত বের হচ্ছে—এমন কয়েক দর্শককে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্টেডিয়ামের নিরাপত্তাকর্মীরা।

অথচ ম্যাচের শুরুতে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে ছিল ভাই-ভাই সম্পর্ক। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’–এর ফাঁকে ফাঁকে ‘রশিদ খান জিন্দাবাদ’ স্লোগানও দিয়েছেন পাকিস্তানিরা। অনেক আফগানি সমর্থক তো পাকিস্তানি সমর্থকদের সঙ্গে গলায়-গলায় ভাব করে খেলা দেখছিলেন।

কিন্তু ইনিংসের শেষে মাঠের ক্রিকেটের উত্তেজনা যেন তাঁদেরও পেয়ে বসেছিল। বিশেষ করে আসিফ ও ফরিদের ঘটনায় পর দর্শকেরাও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।মাঠের খেলায় ১ উইকেটের জয়ে পাকিস্তান আবার এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে। এবারের এশিয়া কাপে ভারতের টিকে থাকতে হলে আফগানদের বিপক্ষে

পাকিস্তানের হারতে হতো। আফগানিস্তানের পতাকার সঙ্গে কাল সে জন্যই অদৃশ্য পতাকা উড়েছে ভারতেরও।কিন্তু সমীকরণের মারপ্যাঁচে যেটুকু সম্ভাবনা ছিল ভারতের, সেটি কাল পাকিস্তানের জয়ে শেষ। গতকালের জয়ে শ্রীলঙ্কাকে সঙ্গে নিয়ে এশিয়া কাপের ফাইনাল নিশ্চিত করেছে পাকিস্তান। আফগানিস্তান ও ভারতের এশিয়া কাপ যাত্রা শেষ এখানেই।

মাঠে রোমাঞ্চকর ক্রিকেট তো ছিলই; সে জন্য হলেও গতকালের ম্যাচটি ‘শারজা ক্ল্যাসিক’ মর্যাদা পাওয়া উচিত। মিয়াঁদাদের শেষ বলের ছক্কা, টেন্ডুলকারের ডেজার্ট স্ট্রোমের কাতারে না হলেও এই ম্যাচকে ঘিরে মাঠের বাইরের যে ঘটনা, রাতটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *